স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশে শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি মাত্র বিভাগ ছিল যার প্রধান ছিলেন ডাইরেক্টর অব পাবলিক ইন্সট্রাকসন৷ তাঁর প্রধান কাজ ছিল শিক্ষা বিস্তারে সরকারি নীতির প্রবর্তন এবং সরকারি বিদ্যালয় ও কলেজ সমূহের তত্ত্বাবধান৷ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তত্ত্বাবধানের জন্য সরকারের কোন সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিলনা এবং এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান সম্পূর্নরূপে স্থানীয় প্রচেষ্টায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত হত৷ বস্তুতঃ এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে সরকারি কারিকুলাম অনুসরণ ছাড়া অন্যান্য সমস্ত প্রশাসনিক কাজই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির উপর ন্যস্ত ছিল৷ অল্প কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠান তখন সময়ে সময়ে বিভিন্ন ধরনের সামান্য মাত্র সরকারি আর্থিক সাহায্য লাভ করত যা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি অনুসারে ব্যয়িত হত৷ প্রকৃত পক্ষে, এ ব্যয়ের যথার্থতা নিরূপনের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক কোন গুরুত্ব আরোপ করা হতনা৷ এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের আয় ব্যয়ের কোন দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করতেন না৷ কাজেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা বিভিন্ন রকম হত এবং অল্প সংখ্যক প্রতিষ্ঠান ছাড়া শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা অনুরূপ সরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য নিধা©রিত বেতন ভাতার তুলনায় অনেক কম ছিল৷ ফলে শিক্ষকগণকে আর্থিক অসুবিধাসহ নানাবিধ প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কাজ করতে হত৷ এই অবস্থায় শিক্ষকগণের পক্ষে পড়াশোনার মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করা সম্ভব হতনা৷ ফলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক এবং শিক্ষার মান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিম্ন পর্যায়ে ছিল৷ এ ছাড়াও স্বাধীনতার পর সঠিক বিবেচনা না করেই অতি উত্সাহের ফলে হঠাত্ করে ব্যক্তি এবং গণ প্রচেষ্টায় অসংখ্য স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই এসব প্রতিষ্ঠান স্থাপনকারীদের উত্সাহে ভাটা পড়ে এবং তাঁরা স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন৷ ফলে আর্থিক সহায়তা হতে বঞ্চিত হয়ে শিক্ষক কর্মচারীগণ ছাত্রবেতন এবং অন্যান্য ব্যবস্থায় অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে, নিজেদের চাকুরী বজায় রাখার স্বার্থে কোন রকমে প্রতিষ্ঠান চালাতে থাকেন৷ ক্রমেই এরূপ অবস্থা দাঁড়ায় যে, সরকারি সাহায্য ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-যাদের উপর দেশের শতকরা প্রায় পঁচানব্বই ভাগ শিক্ষা ব্যবস্থা নির্ভরশীল তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়৷
এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে কাংখিত সফলতা অর্জনের জন্য ১ঌ৭ঌ সালে তদানীন্তন বেসরকারি বিমান চলাচল এবং পর্যটন মন্ত্রী জনাব কাজী আনওয়ারুল হকের সভাপতিত্বে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়ন, প্রশাসন ব্যবস্থার উন্নতি এবং শিক্ষকগণের আর্থিক সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেন৷ সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সব রকম বৈষম্য দূর করার উদ্দেশ্যে এই কমিটি ১ঌ৭ঌ সালের ডিসেম্বর মাসে কতগুলো বিশেষ শর্তাধীনে সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন স্কেল সমপর্যায়ে আনার জন্য সুপারিশ পেশ করেন৷ এই সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ১ জানুয়ারী ১ঌ৮০ হতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুরূপ পে-স্কেল চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন৷ এর ফলে, সরকারের শিক্ষা ব্যয় হঠাত্ করে অনেকগুন বেড়ে যায়৷ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষক-কর্মচারীদের বিপরীতে বরাদ্দকৃত এ বিপুল অংকের টাকা সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত বিধি-বিধান ও নীতিমালা অনুযায়ী ব্যয় করা হচ্ছে কিনা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে কাংক্ষিত সফলতা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে সুষ্ঠু তদারকির জন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ছিল না৷ এ কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসরণ, সরকারি অর্থের সদ্ব্যবহার এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় ৷
বিষয়টির দিকে দৃষ্টি রেখে কাজী আনওয়ারুল হক কমিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলোর জন্য Òপরিদর্শন এবং নিয়ন্ত্রণ পরিদপ্তরÓ নামে একটি পৃথক পরিদপ্তর সৃষ্টির জন্য সুপারিশ করেন৷ উক্ত সুপারিশের ভিত্তিতে এর নাম করণে কিছুটা পরিবর্তন করে ব্রিটেনের "হার ম্যাজিষ্ট্রিজ ইন্সপেক্টরেট অব এডুকেশন"-এর অনুকরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ০১/১০/'৮০ ইং তারিখ হতে "পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর" নামে একটি পৃথক অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয় (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-প্রশাঃ ৪এ-৪২/৮০/৬১৭-শিক্ষা, তারিখঃ ৩০/ঌ/৮০ইং)৷ |